লন্ডন : সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০১:২৪ পূর্বাহ্ন

নিজেদের অস্তিত্ব লড়াইয়ে পিছু হটবে না ইরান

নিজেদের অস্তিত্ব লড়াইয়ে পিছু হটবে না ইরান

নিজেদের অস্তিত্ব লড়াইয়ে পিছু হটবে না ইরান


প্রকাশ: ০৭/০৩/২০২৬ ০৫:৫১:০০ অপরাহ্ন

ইরানের নজীরবিহিন হামলায় প্রাণ বাঁচাতে সুরঙ্গে আশ্রয় নিচ্ছে ইসরাইলের বাসিন্দারা।


যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট ও ইরানের মধ্যে যে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে, তা দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে আকাশ, সমুদ্র, স্থল ও সাইবার সব ফ্রন্টেই আক্রমণ ও পাল্টা আঘাতের ঘটনা ঘটছে।


এতে কেবল সামরিক স্থাপনাই নয়, কৌশলগত বাণিজ্যপথ, কূটনৈতিক মিশন এবং বেসামরিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘই হোক, তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। অন্যদিকে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা নস্যাতে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে টানা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানে দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, নৌ-ঘাঁটি, সামরিক কমান্ড সেন্টার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করাই ছিল অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।


মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, বর্তমানে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা ইরানে চালানো অভিযানে সরাসরি অংশ নিচ্ছে। মোতায়েন রয়েছে ২০০-এর বেশি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, দুটি বিমানবাহী রণতরি এবং দূরপাল্লার বোমারু বিমান। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের নৌবাহিনীর অন্তত ১৭টি জাহাজ ও একটি সাবমেরিন ধ্বংস করা হয়েছে।


ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা নতুন করে ‘ব্যাপক বিমান হামলা’ শুরু করেছে, যার লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও সামরিক অবকাঠামো। তেহরান ও কোম শহরে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। কোওমে অবস্থিত ধর্মীয় পর্ষদের একটি পুরনো ভবনেও হামলা হয়, যদিও হামলার সময় সেটি খালি ছিল বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান আঞ্চলিক মার্কিন ও ইসরায়েলি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের দাবি, তারা মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে।


ইরান আরও দাবি করেছে, তারা একাধিক মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। তবে এসব দাবি এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। মার্কিন পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।


ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রেজা তালাই-নিক জানিয়েছেন, তারা এখনও তাদের ‘সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র’ ব্যবহার করেনি। তার ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ও আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।


সংঘাত দ্রুত উপসাগরীয় অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস প্রাঙ্গণে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, হামলাটি সম্ভবত ইরান থেকে ছোড়া হয়েছিল, যদিও লক্ষ্যবস্তু সরাসরি গোয়েন্দা স্থাপনা ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।


সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেটের কাছেও ড্রোন-সংশ্লিষ্ট একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।


এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে, সংঘাত এখন কেবল ইরানের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই; বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।


বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের দাবি, এই কৌশলগত জলপথ এখন তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এক নৌ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজ ছাড়া অন্যদের চলাচল সীমিত করা হয়েছে।


ফলে শত শত তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে পড়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং ডাটার হিসাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলে হাজারের বেশি জাহাজ চলাচলে বাধার মুখে পড়েছে। জ্বালানি বাজারে ইতোমধ্যেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।


শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা সংঘাতকে আরও জটিল করেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অজ্ঞাত সাবমেরিনের হামলায় জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


শ্রীলঙ্কার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ওই ঘটনায় কমপক্ষে ৮০ জন নিহত হয়েছেন। আর এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে, যে যুদ্ধজাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেকে নিরাপদ ভেবেছিল।


তিনি বলেন, এটি খুবই প্রাথমিক পর্যায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমনটি বলেছেন, সফল হওয়া নিশ্চিত করতে আমাদের যতটুকু সময়ের প্রয়োজন, আমরা ততটুকু নেব।


যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হারানা জানিয়েছে, চার দিনের সংঘাতে ইরানে নিহত বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে বহু শিশু রয়েছে। আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও হামলার অভিযোগ উঠেছে।


অন্যদিকে ইসরায়েলেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে, যদিও বিস্তারিত সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।


ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ, তদারকি ও অপসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় পর্ষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’। খামেনির মৃত্যুর পর এই পর্ষদ ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে বসে উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।


বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নিহত নেতার ছেলে মোজতবা খামেনি উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থেকে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে পরিচিত।


ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানে যে-ই সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হোক না কেন, যদি তিনি ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নেন, তবে তাকেও টার্গেট করা হবে। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠী যাকেই নির্বাচিত করুক, তাকে হত্যার নিশানা বানানো হবে।


যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয় : খামেনির শীর্ষ উপদেষ্টা


নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোকবার বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনা করার ইচ্ছা নেই।


রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, আমাদের মার্কিনিদের ওপর কোনো আস্থা নেই এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করার কোনো ইচ্ছাও নেই। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ যত দিনই চলুক না কেন ইরান তা চালিয়ে যেতে পারবেÑ যেমন মার্কিনিরা ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধে করেছিল।


ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ আগে যা ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তার মতে, এই যুদ্ধের সময়সীমা আট সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে।


তিনি বলেন, আপনি চার সপ্তাহের কথা বলতে পারেন, তবে এটি ছয় সপ্তাহ, আট সপ্তাহ এমনকি তিন সপ্তাহও হতে পারে। দিনশেষে যুদ্ধের গতি ও প্রকৃতি আমরাই নির্ধারণ করছি।


ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার রাত ১০টা থেকে খামেনির তিন দিনব্যাপী বিদায় অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে আয়োজনের প্রস্তুতিতে জটিলতা দেখা দেওয়ায় তা স্থগিত করা হয়েছে।


অনুষ্ঠানের নতুন সময়সূচি পরে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর মাশহাদে তাকে সমাহিত করার কথা। ওই শহরেই জন্মগ্রহণ করেন খামেনি। সেখানে ইমাম রেজার মাজার এলাকায় তার বাবাকেও দাফন করা হয়েছিল।


বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আকাশপথে ব্যাপক বোমাবর্ষণ, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সমুদ্রপথে উত্তেজনা, জ্বালানি সরবরাহে বাধা এবং কূটনৈতিক স্থাপনায় আঘাত সব মিলিয়ে এই সংঘাত এখন বহুমাত্রিক।


যদি দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে এই সংঘাত কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।


আরও পড়ুন